Chatterjee Mansion :
----------------------------------
কলকাতার Business Tycoon নীহার চ্যাটার্জির ঘরে আজ উৎসবের আমেজ... তার বড় কন্যা সুর বাংলার বিখ্যাত সঙ্গীত প্রতিযোগিতা 'মা পা ধা নি সা' তে জয়ী হয়েছে... আর তার কনিষ্ঠা কন্যা অভিরী এর আর্শীবাদ আজ তারই ব্যবসায়ীক বন্ধুর ছেলে দৈবিক এর সাথে...
ব্যবসায়ীক বন্ধুত্বকে পারিবারিক সম্পর্কে বাঁধার জন্য ছোট থেকেই সুর-এর সাথে দৈবিকের বিয়ে ঠিক ছিল... সুর নির্মল, স্নিগ্ধ, নিষ্পাপ সুন্দর, অত্যন্ত চাপা স্বভাবের... দুধ-আলতার মতো গায়ের রঙ, গোলাপের পাপড়ির মতো ঠোঁট, কালো ভ্রমরের মতো কালো কালো টানা টানা আয়ত চোখ, টিকল নাক, মেঘের মতো পিঠ ছাপানো চুল, নরম নরম পুতুল পুতুল গড়ন... দৈবিকের সাথে তার প্রথমে বন্ধুত্ব, তারপর তারা সারা জীবনের সাথী হবার অঙ্গীকারের আবদ্ধ ছিল... কিন্তু সুর নিজের অন্তরকে কারুর সামনেই প্রকাশ করতে পারে না... তাই ধীরে ধীরে যখন দৈবিকের সাথে তার অন্তরের বাঁধন ধীরে ধীরে আলগা হতে লাগল, সে বরাবরের মতোই সে স্থিরাই ছিল... সুরের সাধনাকে আঁকড়ে ধরে তার সব নির্বাক কান্না, যন্ত্রণাকে সুরের মুর্ছনাতে ভাসিয়ে দিয়েছিল... প্রেমের প্রথম ধাপেই প্রেমিকার ভূমিকায় ব্যর্থ সুর নিজেকে ক্রমশঃ গুটিয়ে নিয়েছিল অনাবশ্যকতার উপনামে... সুর যে 'প্রেমের পিয়াসী প্রেমিকা' হতে চায় নি, সে হতে চেয়েছিল 'ভালোবাসায় সংরক্ষিতা' হতে.... কিন্তু আজ সুর বারবার ফিরে যাচ্ছে সেই ফিরে আসা সময়ে... কিছু না বলা কথায়, অগোছালো কিছু পড়ে থাকা ভালোবাসায়... ছোটোবেলার সেই চোখের মায়ার সাগরে হারানো মিষ্টি হাসি মুখ, আর সময়ের ব্যস্ততাকে স্তব্ধ করা স্মৃতির আফসোস... মরিচিকার সমাজ আজ বড্ড ব্যস্ত... তাই হৃদয়ের ঐশ্বর্য আজো আড়ালে লুকানো, হৃদয়ের ব্যর্থ আবেগ আজ প্রতারিত...
সুর-এর চিন্তার আবেশ কাটে রোহিনীর দরজার ধাক্কার আওয়াজে... রোহিনী নীহারের দ্বিতীয়া স্ত্রী, সুরের স্বর্গীয়া মা রাগিনীর ছোট বোন, অভিরী-র মা... সবাই বলে, সে সুরের জন্যই নীহারকে বিয়ে করতে বাধ্য হয়...
রোহিনী : নদী... নদী রে ... দরজা খোল তো মা....
সুর দ্রুত চোখ মুছে মুখে স্মিত হাসি টেনে দরজা খোলে,
সুর : কিছু বলবে মামনি !!!
রোহিনী সুরের বিছানায় অভিরীর Peach রঙের Designer লেহেঙ্গা আর কল্যান জুয়েলার্সের মুহুরাতের ভারী গয়নাগুলো রাখে...
রোহিনী : মিষ্টিকে একটু তৈরি করে দে না মা...
সুর : আচ্ছা মামনি, আমি ওকে তৈরি করে দেবো...
রোহিনী : এই তো আমার সোনা মেয়ে... হ্যাঁ রে, নদী- তোর কষ্ট হচ্ছে না তো মা !!!
সুর : কিসের কষ্ট মামনি !!!
নেপথ্যে : এই যে দৈবিক আমার হয়ে গেল...
সুর পিছনে তাকিয়ে দেখে অভিরী তাচ্ছিল্যের হাসি হাসতে হাসতে তার দিকে এগিয়ে আসছে... চোখ ঝলকানো রূপ অভিরীর... যে একবার দেখবে, সে চোখ ফেরাতে পারবে না...
সুর : দৈবিক তোর জন্যই তৈরি হয়েছিল রে মিষ্টি...
অভিরী : নিজেকে একটু বদলা দিদিভাই... একটু Update কর... নিজের Utopian জগৎ থেকে বের হ...
সুর, অভিরী, দৈবিক এক স্কুলে পড়লেও কলেজে উঠে সুর Music Hons নিয়ে অন্য কলেজে ভর্তি হয়... অভিরী আর দৈবিক এক কলেজে পরার সুবাদে একে অপরকে নতুন করে চিনেছে, আর সেখান থেকেই একে অপরের প্রতি ভালবাসা অনুভব করেছে... আর ধীরে সুর-এর সাথে দৈবিকের বাঁধন শিথিল হয়ে পড়ে... বাঁধন যত শিথিল হয়েছে, সুর তত সুরের সাধনায় মগ্ন করে নিয়েছে নিজেকে... তার জীবনের সব বাঁধনই বড় শিথিল... অভিরীকে সাজাতে সাজাতে কোনো এক গোপন বেদনায় তার অন্তর ক্ষতবিক্ষত, রক্তাক্ত হতে থাকে...
অভিরী : আজ আমাকে যা লাগছে না দিদিভাই, দৈবিক Just চোখ ফেরাতে পারবে না...
অষ্টাদশী অভিরীর এই ছেলেমানুষী দেখে সুরের মুখে একটা মৃদু হাসি খেলে যায়...
অভিরী : তুই কি পরবি দিদিভাই !!!
সুর : আমি কিছু একটা পড়ে নেব...
অভিরী : তোর Wardrobe-টা খোল তো... দেখি কি আছে !!! আমার তো একটা Prestige আছে বল... দেখি সাদা ছাড়া অন্য কোনো রঙ খুঁজে পাই কি না !!! তুই তো আবার সাক্ষাৎ সরস্বতীর প্রতিমূর্তি...
সুর : আমাকে নিয়ে পড়লি কেন !!! আজ তো তোর দিন... আজ তো তোকেই সবাই দেখবে...
অভিরী : (ব্যঙ্গাত্মক স্বরে) তোকেও তো দেখবে... Afterall, 'মা পা ধা নি সা' -র বিজয়িনী বলে কথা...
সুর : আমার কথা ছাড়...
অভিরী সুরের Wardrobe ঘাটতে থাকে... হঠাৎই একটা সাদা রেশম ঢাকাই টেনে বার করে...
অভিরী : এর সাথে atleast একটা Multi-Colour Blouse পরিস দিদিভাই...
সুর এবার একটু হেসেই ফেলে... আলমারি থেকে একটা হাল্কা দুধ-আলতা ব্লাউজ বার করে বলে,
সুর : এইটা চলবে !!!
অভিরী : সত্যিই !! তুই না দিদিভাই !! কে বলবে তুই আমার থেকে মাত্র দু'বছরের বড় !!! না কি ইচ্ছে করে এমনি করছিস তুই !!!
সুর : (অবাক হয়ে) ইচ্ছে করে !!!
অভিরী : নিজের পরাজয়টা মেনে নিতে পারছিস না...
সুর : তোর আর দৈবিকের সাথে আমার কোনোদিনই কোনো প্রতিযোগিতা ছিল না রে... আসলে জীবনের সাথেই আমার বাঁধনটা বড় আলগা....
অভিরী : তোর এই ভারি ভারি কথা আমি বুঝি না... ছাড়, তাড়াতাড়ি তৈরি হয়ে আয়....
ধান দূর্বা দিয়ে দুই বাড়ির লোক দৈবিক আর আভিরীকে আর্শীবাদ করলো... এতদিনের চেনা পরিচিত মানুষগুলো নতুন সম্পর্কের মোড়কে বাঁধা পড়ল, কেবল ব্রাত্য থাকলো সুর... সে যন্ত্রমানবের মতো নির্বাক হয়ে সব কর্তব্য করে গেল... মাঝে মাঝে কেবল তার অবাধ্য মন আর চোখ দৈবিকের দিকে চলে যাচ্ছিল.. দৈবিকের সাথে অনেক একান্ত মূহুর্ত ছিল, সেগুলো বারবার ভিড় করে আসতে থাকে... মুখের স্মিত হাসির আড়ালে সেই যন্ত্রণা লুকাতে থাকে... এরপর সবাই মিলে দারুণ খাওয়া-দাওয়া হলো... কিন্তু সুর যে মুখে কিছুই দিল না, কেউ খেয়াল করলো না... বেশ কিছুক্ষণ পর রোহিনী সুরকে বলে, অভিরী আর দৈবিক-কে ডেকে দিতে... খাওয়া-দাওয়ার পর সবাই ওদের একটু একান্তে ছেড়ে দিয়েছিল... সুর সবকিছু গুছিয়ে রেখে ওদের ডাকতে গেল...
সিঁড়ি দিয়ে অভিরীর ঘরে ঢোকার মুখে সুর দেখে, পড়ন্ত বিকেলে আলোতে দৈবিক অভিরীকে নিজের কাছে টেনে তার ঠোঁটে গাঢ় চুম্বন করছে, দৈবিকের এরূপ আচরণে অভিরী শিহরিত হতে থাকে... চোখ বন্ধ করে সবটুকু আদর গ্রহণ করতে থাকে... সুর ধাক্কা খেয়ে সিঁড়ি থেকে সরে আছে... কিছুক্ষণ পর ওদের ডেকে দিয়ে সুর নিজের ঘরে গিয়ে দরজা লাগিয়ে মায়ের ফোটোর সামনে গিয়ে ক্ষণিক দাঁড়ায়... তারপর নিজের ডায়েরিটা টেনে নেয়...
প্রিয় অসম্পূর্ণতা,
পূর্ণতা না পাওয়া ভালোবাসা অতীতের মানুষটাকে ঘিরে হৃদয়ের মাঝে কেন বারবার আবর্তিত হতে থাকে !! আচ্ছা, প্রেমিকা হতে গেলে কি সুন্দরী হতেই হয় !!! কোনো সাজ, আড়ম্বরহীনভাবে স্বচ্ছ আমাকে নেবে তো তোমার কাছে টেনে !!! শুধুমাত্র এই কারণেই একদিন আমার আর দৈবিকের সম্পর্কটা শেষ হয়ে দৈবিক আর অভিরীর Journey-টা শুরু হয়... আর আমার Journey-টা শুরু হয় দৈবিককে ভুলে যাওয়ার... আমি এখন দৈবিককে ভুলে যাওয়ার চেষ্টায় রত... দৈবিক এখন অভিরীর প্রেমে মশগুল... তাই ওদের নতুন জীবনে জড়িয়ে ওদের আর বিব্রত করতে চাই না... গুটিয়ে নিতে থাকলাম নিজেকে... প্রথম প্রথম কি প্রচন্ড কষ্ট হতো !!! বারবার মনে হতো কেন দৈবিক আমাকে ভালোবেসেও ছেড়ে চলে গেল !!
কান্না পেত খুব, কিন্তু আমি তো সহজে কাঁদতে পারি না... তাই কেমন একটা দমবন্ধ হয়ে আসতো আমার... মাঝে মাঝে মনে হোত মরে যাই... কিন্তু দৈবিকের থেকে পাওয়া বিশ্বাসঘাতকতা আমাকে ওকে ভুলতে খুব সাহায্য করেছিল... আর সময়... সময়ের সাথে সাথে সব স্মৃতি চাপা পড়তে লাগল... গানকে আশ্রয় করে সবকিছুর সাথে অভ্যস্ত হয়ে গেলাম... জীবনের সাথে তাল মেলাতে মেলাতে কখন যে দৈবিকের দেওয়া আঘাত, দৈবিকের স্মৃতিগুলো হৃদয়ের গহীন গভীরে চাপা পড়ে গেল, টেরই পেলাম না...
কিন্তু আজ ওদের দেখে কয়েক মূহুর্তের জন্য যেন ঘোর লেগে গিয়েছিল... কিসের একটা অমোঘ আকর্ষণ আমাকে বারবার টানছিল !!! না... না... ওদের দিকে নয় !!! নিজের অধিকার ছিনিয়ে নেওয়া তো দূরের কথা, সাধারন অধিকার জোর করে ফলানো সম্ভব নয় আমার পক্ষে... অমোঘ আকর্ষণ ছিল কিছু প্রশ্নের দিকে...
আচ্ছা, চোখে কাজল না দিয়ে ভালোবাসামাখা, মায়াবি চোখে তোমার মুখের পানে চেয়ে থাকলে তোমার চোখে সুন্দরী হতে পারব কি !!! শাড়ির খোলা আঁচল, খোলা চুল আর নেলপালিশ বিহীন আঙুল দিয়ে তোমার চুলে হাত বুলিয়ে দিলে- পচ্ছন্দ হবে তোমার !!! তোমার হাতে হাত রেখে যদি তোমার কাঁধে মাথা রেখে চোখ বন্ধ করে চুপ করে থাকি, তাহলে কি প্রেমিকা হতে পারব না তোমার !!! রূপ ছাড়া শুধু ভালোবাসা নিয়ে তোমার সামনে দাঁড়ালে ভালোবাসতে পারবে না আমাকে !!! সাজবিহীন নারীর সৌন্দর্যের পূজারী কি হতে পারবে তুমি !!!
বসন্ত রঙা আবির প্রেমিকার কপালে শোভা পায়, তা কেবল রূপকথাতেই মানায়... বাস্তবের জগতের ভালোবাসা আজো কাঁদায়... হাজারো প্রতিকূলতার মাঝে প্রকৃতি আজো তার পুরুষকে খোঁজে- যে তার এক চিলতে মায়াবী হাসিতে পরম তৃপ্তি পাবে, তার আলতো খোঁপার আবেশে ভেসে অপার শান্তি পাবে... যে পথের অতীতে পথিক ছিলে তুমি, আজ সেই পথে ধাবমান একা আমি... কিন্তু আজ তুমি অতীত, আর আমি হলাম আগামী... তোমার ধুলোমাখা মুহুর্তগুলোতে থেকে যায় ধ্বংসাবশেষ.... আমি যে আত্মার উর্ধ্বের ভালোবাসাকে খুঁজি, যা কেবল অনুভব করা যায়...
(কলমে : ঋ)
অপহরণ পর্ব :
--------------
সুর ডায়েরি লেখা বন্ধ করে রোহিনীর ডাকে... এদিকে বিয়ের জোর তোড়জোর চলছে... আজ তারা কনের জন্য বিয়ের বেনারসি কিনতে যাবে, ওদিক থেকে দৈবিক-রাও আসবে অভিরীর Reception-এর শাড়ি কিনতে... সুরকেও যেতে বলেছিল... কিন্তু সুর যায় নি... সে অভিরীর জন্য সামনের কালি মন্দিরে পুজো দিতে যায়... যানজট এড়ানোর জন্য সুর রাস্তা এড়িয়ে পাশের গলিটা ধরে... এই গলিটা একটু ফাঁকাই থাকে... হঠাৎই একটা পুরনো সাদা Ambassador সুরের পথ রোধ করে দাঁড়ায়... সুরকে সাবধান হবার সুযোগ না দিয়েই দুজন যুবক, যাদের মুখ কালো কাপড়ে আচ্ছাদিত- জোর করে সুরকে ধরে তার মুখে একটা রুমাল চেপে ধরে... সুর কিছু বুঝে ওঠার আগেই একটা মিষ্টি গন্ধ এসে তার নাকে আসতেই ধীরে ধীরে সুর জ্ঞান হারিয়ে ফেলে... বলিষ্ঠ চেহারার একজন সংজ্ঞাহীন সুরকে কোলপাজা করে তুলে গাড়িতে উঠিয়ে নেয়... সুরের প্রসাদ মাটিতে পড়ে থাকে, ব্যক্তি দু'জন অতি দ্রুত গাড়ি করে চম্পট দেয়...
অজ্ঞাত ডেরা :
---------------------
ঠিক কত রাত সুর-এর পক্ষে অনুমান করা সম্ভব নয়... চোখ খোলার চেষ্টা করে সুর... কিন্তু পারে না... সে একটু নড়াচড়া করতেই কেউ বুঝি তার কাছে এগিয়ে এলো... তার চোখে মুখে জলের ছিটে পড়তেই ধীরে ধীরে চোখ খোলে সে.... কিন্তু রাতের আর ঘরের আঁধারে কিছুই স্পষ্ট করে দেখতে পায় না সে.... গালে আলতো চাপড় মারে কেউ.... তারপর জলদগম্ভীর গলায় আগন্তুক জিজ্ঞেস করে....
আগন্তুক : Hello, Miss Sur Chatterjee !!! শুনতে পাচ্ছেন !!! চোখ খুলুন... কেমন আছেন এখন !!! কষ্ট হচ্ছে বুঝি !!! ও হো হো হো ওওও... খুব লাগছে তাই না !!!
ঘোরটা একটু কাটতেই সুর অনুমান করতে পারে, তার হাত খুব শক্ত না হলেও বাঁধা আছে, আর মুখে কাপড় গোজা...
আগন্তুক : কষ্ট হচ্ছে ম্যাডাম !! হবারই কথা !!! কষ্ট কাকে বলে তাতো কখনো অনুভবই করেন নি.... মুখে সোনার চামচ নিয়ে জন্মেছেন... বাবার টাকার জোরে প্রতিযোগিতা জিতলেন... লাখ লাখ টাকা পেলেন...
এবার সুর প্রতিবাদ করতে যায়- তার এই প্রতিযোগিতার ফলাফল তার সারাজীবনের সাধনার নৈবেদ্য... কোথাকার কে এসে তার সেই নৈবেদ্যকে অসম্মান করবে, সেটা সুর-এর পক্ষে মেনে নেওয়া অসম্ভব... সুর নড়ে চড়ে তীব্র প্রতিবাদ করতে যায়... কিন্তু মুখ থেকে গোঙানি ছাড়া আর কিছুই বের হয় না....
আগন্তুক : আরে !!! করছো টা কি !!! অত ছটফট করো না... এই নরম পুতুলের মতো হাতে লেগে যাবে তো !!! আচ্ছা দাঁড়াও, কষ্টটা একটু কমিয়ে দিই...
আগন্তুকের এ হেন প্রস্তাবে সুর নিজের ভাব প্রকাশ করতেই ভুলে যায়... ধীরে ধীরে তার সবটা মনে পড়ে... সে অভিরীর জন্য পুজো দিয়ে ফিরছিল... হঠাৎই একটা পুরনো সাদা Ambassador তার পথরোধ করে... তারপর সেই মুখঢাকা দুই যুবক... সেই মিষ্টি গন্ধটা... তারপর !!!? আর কিছু মনে নেই সুর-এর... তাহলে কি ওই দুই যুবক তাকে তুলে এনেছে !!! সে কি 'অপহৃত' !!! কি করতে চাইছে তারা সুর-কে অপহরণ করে !!! প্রতিযোগিতার টাকাটা চাইবে !!! না কি তার তথাকথিত 'বাবা' নীহার চ্যাটার্জির কাছ থেকে মুক্তিপণ চাইবে !!! না কি তার আরো বড় কোনো ক্ষতি করবে !!! নিজের মনের সাথে অন্তর্দ্বন্ধ চালাতে চালাতে সুর নিজের হাতের বাঁধন খোলার চেষ্টা করতে থাকে... সুর-এর নিষ্ফল চেষ্টা দেখে কোনো বাক্য ব্যয় না করে আগন্তুক উচ্চস্বরে হেসে ওঠে... তারপর পাশের যুবকটি ইশারায় সুর-এর মুখের কাপড়টা খুলে দিতে বলে...
সুর : তোমরা কারা !!! আমাকে কেন এখানে ধরে এনেছো !!! কি ক্ষতি আমি তোমাদের !!! ছেড়ে দাও... ছেড়ে দাও আমাকে Please.... কেন আমার সম্মানে অযথা কালি লাগাচ্ছো !!! আমি তো তোমাদের চিনিও না....
আগন্তুক : জানিইইইইইই
আগন্তুক আচমকা চিৎকারে সুর হতভম্ব হয়ে যায়... চোখ ফেটে জল আসে তার...
সুর : (কান্নাভেজা গলায়) আমি কি ক্ষতি করেছি তোমাদের !!! কেন আমার ক্ষতি করছো !!!
আগন্তুক : (ধমকের সুরে) এই... কি ক্ষতি করেছি তোমার !!! তোমার সাথে কোনো অশালীন ব্যবহার করেছি !!! তোমাকে ছুঁই নি পর্যন্ত....
সুর : দেখো... আমি Business Tycoon নীহার চ্যাটার্জির মেয়ে, তার উপর সদ্য অতো বড় প্রতিযোগিতা জিতেছি... কাল না হয় পরশু, পুলিশ ঠিক Trace করে আমাকে খুঁজে বের করবে... কিন্তু এই অপহরণের রাতের কালিমা আমার জীবন থেকে সমাজ কখনো মুছতে দেবে না... সারাজীবনের জন্য একটা কলঙ্ক লেগে যাবে আমার জীবনে...
আগন্তুক : (হিমশীতল গলায়) এইটাই তো আমি চাই... তোমার বাবা বুঝুক, আপন কারুর গায়ে সারাজীবনের মতো মিথ্যে কলঙ্ক লাগালে ঠিক কেমন লাগে !!! একটা মিথ্যে কলঙ্ক যখন আপনজনদের জীবন তছনছ করে দেয়, যখন তাদের স্বেচ্ছামৃত্যুকে বেছে নিতে হয়- তখন এই সবটা চোখের সামনে দেখতে ঠিক কতটা কষ্ট হয় !!!
সুর লক্ষ্য করলো, শেষ কথাগুলো বলার সময় আগন্তুকের গলাটা কেমন যেন কেঁপে উঠল....
Chatterjee Mansion :
-----------------------------------
দেবতনু : দেখো নীহার, আমরা সবটা বুঝতে পারছি... কিন্তু তোমাকে তো এটাও বুঝতে হবে, বিয়ের আর মাত্র এক সপ্তাহ বাকি... এর মধ্যে সুর-কে খুঁজে পাওয়া না গেলে তোমাদের সাথে আমাদেরও যথেষ্ট Embarrassed Situation-এর মধ্যে দিয়ে যেতে হবে- বুঝতে পারছো !!!
নীহারবাবু একজন দক্ষ IPS অফিসারকে নিযুক্ত করে সুর-কে খোঁজার জন্য.... নীহারবাবু কোনোভাবেই চান না, সুর-এর নিখোঁজ হওয়া নিয়ে থানা, পুলিশ, মিডিয়া- কিছু করতে... আর সাতদিন পর অভিরীর বিয়ে... তার মধ্যে এইসব...
IPS Officer : যে বা যারা সুর-কে Kidnap করেছে, তারা খুব ঠান্ডা মাথায় Plan করেছে... না হলে, বেছে বেছে শহরের ব্যস্ততম রাস্তার পাশের গলি বাছলো, যেখানে কোনো CCTV নেই... আর সামনেই পুজো দিতে গেছে বলে সুর ফোন নিয়ে যায় নি, তাই ফোন মারফত Trace করার সুবিধাও নেই...
নীহার : আচ্ছা, সুর-এর Phone Records...
অভিরী : সুর-এর Phone Records দেখে কোনো লাভ নেই, Dad... ও তো এমনিতেও Phone lock করে রাখে না, চাইলে আপনারা দেখতেই পারেন... তবে আমি লিখে দিতে পারি, সুর-এর Phone Records-এ এমন কোনো Call বা Message বা w******p Message নেই, যাতে কি না কোনো সন্দেহ বা Clue পাওয়া যায়...
IPS Officer : তবে একটা কথা ঠিক, ওরা অনেকদিন ধরেই সুর-এর উপর লক্ষ্য রেখেছে.... সুর-এর সম্পর্কে সব তথ্য নিয়ে ওরা কাজটা করেছে... মানে সুর কখন, কোথায় যায়, কখন ওর সাথে গাড়ি থাকে বা ওর সাথে Purse থাকে বা থাকে না... আর থেকেও বড় ব্যাপার, প্রায় আট ঘন্টা হতে চললো- এখনো মুক্তিপণ চেয়ে কোনো ফোন এলো না... তাহলে, অপহরণকারীদের দাবিটা কি !!!
নীহার বাবু আর IPS Officer খুঁটিয়ে লক্ষ্য করছে TV-এর Screen-এ... ওই গলিটার Footage পাওয়া যায় নি, তাই ওরা বড় রাস্তার Footage দেখছে... যদি কোনো সন্দেহভাজন গাড়ি বা কোনো Clue পাওয়া যায়... কিন্তু ব্যস্ততম রাস্তার অবিরত গাড়ির ভিড়ে কিছুই বোঝা গেল না, সুর কোন গাড়িতে আছে !!! একই সময় একই Signal দিয়ে একাধিক গাড়ি চলে যাচ্ছে... হতাশ হয়ে পড়ল IPS Officer আর নীহার... কিছুই মাথায় আসছে না তাদের- কোন পথে এগোবে তদন্ত !!!
অজ্ঞাত ডেরা :
---------------------
সুর : দেখুন, আমি বুঝতে পারছি আপনি কোনো কঠিন সময়ের মধ্যে দিয়ে গেছেন... যখন পুরনো অমলিন স্মৃতিরা দোলা দিয়ে যায়, মূহুর্তরা প্রতিক্ষণে কাঁদায়... কিন্তু তাই বলে, যে দোষী নয়- তাকে আঘাত দিতে হবে !! জীবনের প্রতিটা কঠিন সময়ে নিজের ভালো রাখাটা, নিজের অন্তরকে শান্তি প্রদান করাটা খুব দরকার... জীবনের গোলক ধাঁধার সমাধান খুঁজতে আমরা সবাই তো ব্যস্ত বলুন...
আগন্তুক : এইসব বড় বড় কথাগুলো মুখে বলা খুব সহজ মিস সুর চ্যাটার্জি... সহ্য করাটা নয়... পারবে... পারবে... পারবে সহ্য করতে আমি যদি তোমাকে !!!
বলেই আগন্তুক সুরের বুকের আঁচল টেনে সরিয়ে সুর-এর গ্রীবার কাছে নিজের মুখ নামিয়ে আনে...
নাহহহহহহ.... নাহহহহ..... Please....
আর্তনাদ করে ওঠে সুর... কাপড়ে মুখ ঢাকা থাকলেও আগন্তুক চোখ তুলে দেখে জানলা দিয়ে এক ফালি চাঁদের আলো এসে পড়েছে সুর-এর নিষ্পাপ মুখের উপর- চাঁদের আলো এমনভাবে এসে পড়েছে সুর-এর মুখে যেন সুর-এর মুখটি চাঁদের জোছনায় মাখা, চোখের পাতায় যেন ভোরের শিশির কণা লেগে... চোখ বন্ধ করে সুর ভয়ে থরথর করে কাঁপছে... কিছুক্ষণ অপলকে তাকিয়ে থাকে সুরের দিকে.... তারপর আগন্তুক নিজেকে সরিয়ে আঁচল দিয়ে ঢাকা দিয়ে দেয় সুরের ঠিক যেন ফুলের কেশরের উন্মুক্ত পরাগ রেণুর মতো কোমল দেহতনু.... অবিন্যস্ত ভাবে মুখের উপর ছড়িয়ে থাকা চুলের গুচ্ছগুলোকে একটু একটু করে সরায়... সুর-এর মাথায় ভরসার হাত রেখে আত্মগ্লানি ভরা কন্ঠে বলে,
আগন্তুক : Sorry.... I... I'm extremely Sorry.... আসলে আমি মাথাটা ঠিক রাখতে পারি নি...
সুর : (কাঁদতে কাঁদতে) অনুভূতি আর মানুষ, দুই-ই অবিনশ্বর... কঠিন সময়ের অনুভূতিগুলো আমাদের শিখিয়ে দেয় জীবন মসৃণ নয়... সেখানে অনেক অলি-গলি, চড়াই-উতরাই আছে... জীবনের প্রতিটা অধ্যায় জীবনের সামনের পথে এগিয়ে যাবার বিভিন্ন ধরনের শিক্ষা শিখিয়ে যায়... আমরা ভুল করি নতুন নতুন অভিজ্ঞতা লাভ করার জন্য, কিন্তু হার মেনে নিলে চলবে না.... ছোট ছোট ভাঙন থেকেই কিন্তু জীবন নষ্ট হতে শুরু হয়, কিন্তু একবার ভাঙন ধরলে কিন্তু পুরোটা ভেঙে চুরে রক্তাক্ত হতে বেশি সময় লাগবে না... জীবন তো ভাঙাগড়ার মাঝেই পরিপূর্ণতা লাভ করে... কিন্তু জীবনের চোরাগলির পথে অনেক অলিগলির অন্ধকার বাঁক থাকে, সেখানে পথ হারালেই কিন্তু নিজেকে খুঁজে পাওয়া মুশকিল...
আগন্তুক : এত ভাবতে হবে না তোমাকে... একটু পরে তোমার জন্য খাবার পাঠানো হবে... আর হাতটাও খুলে দেওয়া হবে... খেয়ে নিও... আশা করি বুঝতে পারছো, আমরা তোমার জন্য Harmful নই... So Please, Cooperate with Us....
কিছুক্ষণ পর :
~~~~~~~~~~
আগন্তুক : কি রে !!! খাবার খেয়েছে !!!
ছোটকু : নাহহহ দাদা... অজ্ঞান হয়ে গেছে... গায়ে ধুম জ্বর...
আগন্তুক : হুমমমম... খুব ভয় পেয়ে গেছে... Stress থেকেই এমনটা হয়েছে... শোন, আমি একটা Injection নিয়ে আসছি... তুই একটা খাটিয়ার ব্যবস্থা কর... তারপর তুই চলে যাস... I'll take care of Her....
(কোন পথে এগোবে তদন্ত !!! কে এই আগন্তুক !!! সে কি সুর-এর জীবনে কি হয়ে এলো- আর্শীবাদ না অভিশাপ !!!)