পৃথিবীবিখ্যাত মার্কিন কমেডিয়ান রবিন উইলিয়ামস সারাজীবনই সারাপৃথিবীকে হাসিয়ে গেছেন, আর সবার অগোচরে নিজে ডুবে ছিলেন তীব্র বিষণ্ণতায়। পর্দায় দর্শক হাসাতে ব্যস্ত মানুষটিরই জীবনে আদতে কোনও হাসিই ছিল না। পৃথিবীর ইতিহাসে অন্যতম শ্রেষ্ঠ প্রবাদপ্রতিম এই কৌতুকঅভিনেতা বিষণ্ণতা থেকে বাঁচতে নিজের বাড়িতে দড়িতে ঝুলে আত্মহত্যা করেন। হ্যাঁ, তাঁর মতো একজন বাহ্যিকভাবে সদা-হাস্যোজ্জ্বল ঝলমলে মানুষ সবার অলক্ষে বেছে নিয়েছিলেন স্বেচ্ছামৃত্যুর পথ।
যশ, খ্যাতি, রূপ আর কাঁড়ি-কাঁড়ি অর্থের মালিক লাস্যময়ী অপূর্ব সুন্দরী অভিনেত্রী মেরিলিন মনরো রঙির দুনিয়ার অন্তরালে দিনের পর দিন ভুগেছেন অদ্ভুত রকমের ভীষণ অন্তর্যন্ত্রণায়। জীবনের নানান ঘাত-প্রতিঘাতে রিক্তনিঃস্ব, চারপাশের অগনিত মানুষের ভিড়েও নিঃসঙ্গ-একাকী মনরো মাত্র ছত্রিশ বছর বয়সে সমস্ত জাগতিক দহন থেকে স্বেচ্ছায় মুক্তি খুঁজেছেন মৃত্যুর কাছে, অতিরিক্ত পরিমাণে ঘুমের ওষুধ খেয়ে।
বিশ্বকাঁপানো পপতারকা অগাধ সম্পদের মালিক মাইকেল জ্যাকসন উচ্চমাত্রার ঘুমের ওষুধ ছাড়া কখনও এক রাতও ঘুমোতে পারতেন না। ওষুধের তীব্র পার্শ্বপ্রতিক্রিয়ার কারণে তিনি মারা যান মাত্র ৫০ বছর বয়সে। না, এই পৃথিবীর সর্বকালের সর্বসেরা পপতারকার মৃত্যুটি শান্তির হয়নি। যাঁর গানের লাইন মাথায় এলেও আমাদের হাত-পা নাচতে থাকতে অবচেতনভাবেই, তাঁর নিজের ব্যক্তিগত জীবনটি ছিল নিথর ও নিস্তরঙ্গ।
পৃথিবীর ইতিহাস সাক্ষ্য দেয়, ‘সুখ’ জিনিসটা বরাবরই একটি আপেক্ষিক বিষয় থেকে গেছে। সব কিছুর পূর্ণতার ভিড়েও কেউ কেউ নিদারুণ অসীম শূন্যতায় ধুঁকে ধুঁকে সারারাত ঘুমোতেই পারে না। আবার জাগতিক কোনও বিত্ত না-থাকা অনেক মানুষই রাত নামার আগেই আরাম করে নাক ডেকে ডেকে ঘুমিয়ে পড়ে।
আপনি যাকে দেখে ‘আহ্, কী সুখী, কী পরিপূর্ণ একজন মানুষ!’ ভেবে ভেবে নিজের দিকে তাকিয়ে দীর্ঘশ্বাস ছাড়ছেন, সেও হয়তো, আপনার মতোই, অন্য কাউকে দেখে দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে বিষণ্ণতার হাত থেকে বাঁচতে ঘুমের ওষুধে সুখঘুম খুঁজে যাচ্ছে অবিরত।
এই জগতের শ্রেষ্ঠ মোটিভেশনাল স্পিকার ও বেস্ট-সেলিং রাইটার ডেল কার্নেগি সারাটি জীবন ধরে অন্যদের বেঁচে থাকার অনুপ্রেরণা জুগিয়ে গেছেন নিরলসভাবে, আর ব্যক্তিগত জীবনে নিজে বেঁচে ছিলেন একজন অসুখী, বিষণ্ণ মানুষ হয়ে।
আসলে কী জানেন, গুরু আইয়ুব বাচ্চুর গানের লাইনগুলিই এই পৃথিবীর সবচাইতে বড়ো সত্য:
সুখেরই পৃথিবী, সুখেরই অভিনয়,
যত আড়াল রাখো, আসলে কেউ সুখী নয়।
নিজ ভুবনে চিরদুখী, আসলে কেউ সুখী নয়।
…খোঁজ নিয়ে দেখুন, আদতে আমরা কেউই সুখী নই, একদম কেউই না!
বেঁচে থাকতে অনেক কষ্ট হয়, জানি। তবুও বাঁচুন, হারিয়ে যাবেন না। দায়িত্ব নিয়ে বলতে পারি, আপনার চাইতে দুঃখী অসুখী ব্যর্থ মানুষ এই পৃথিবীতে অসংখ্য আছে। সুখীদের ভিড়ে দুঃখী হয়ে নয়, বরং বেশি দুঃখীদের ভিড়ে অল্প দুঃখী হয়ে বাঁচার সমস্ত আয়োজন আপনার চোখের সামনেই পড়ে রয়েছে।
অভিজ্ঞতা থেকে বলছি, মাপাহাসি জীবনের মাপকাঠি নয়, বরং চাপাকান্নাই জীবনের মাপকাঠি।